Posts

খলিসানির বোস বাড়ির দুর্গাপুজো, চন্দননগর, হুগলি (Durga Puja at Bose Bari, Khalisani, Chandannagar, Hooghly)

Image
চন্দননগর বলতেই অধিকাংশ মানুষের মনে পড়ে জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা। কিন্তু হুগলির এই জনপদেই রয়েছে পাঁচ শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন এক দুর্গোৎসব—খলিসানির বোস বাড়ির দুর্গাপুজো। পরিবারের প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে, ২০২৬ সালে এই পুজো ৫১৯ বছরে পদার্পণ করল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে তাম্রলিপ্ত, অর্থাৎ বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থেকে সপরিবারে নৌকায় যাত্রা করে হুগলির সরস্বতী নদীর তীরবর্তী বিলকুলি গ্রামে এসে পৌঁছন করুণাময় বসু। ব্যবসার উদ্দেশ্যে এখানে বসতি গড়ে তোলেন তিনি। পরবর্তীকালে তৎকালীন শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূত্রে খলিসানি গ্রামের দায়িত্ব লাভ করেন এবং সেখানে নির্মাণ করেন নিজের বাড়ি। প্রথমে প্রতিষ্ঠা করেন পরিবারের আরাধ্য দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির। তার প্রায় দশ বছর পরে শুরু করেন দুর্গাপুজো। করুণাময় বসুর মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবীদাস এবং পরবর্তী প্রজন্ম এই পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ১৭০২ সালে দেবীদাসের প্রপৌত্র সহস্ররাম বসু তাঁর আট পুত্রের জন্য নির্মাণ করেন বিশাল অট্টালিকা, যা আজও ‘আটবাড়ি’ নামে পরিচিত। এই বাড়ির পাঁচ খিলানবিশিষ্ট ঠাকুরদালানেই আজও অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপুজো...

দেবানন্দপুরের দত্ত মুন্সি বাড়ির দুর্গাপুজো, ব্যান্ডেল হুগলি (Durga Puja at the Dutta Munshi Family Home, Debanandapur, Bandel, Hooghly)

Image
হুগলির দেবানন্দপুর। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভূমি এই গ্রাম একসময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। সরস্বতী নদীকে কেন্দ্র করে সপ্তগ্রাম বন্দরে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে কাঠের ব্যবসায় প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন দেবানন্দপুরের জমিদার দত্ত মুন্সিরা। তাঁদেরই দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে চার শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস। দুর্গাদালানের গায়ে লাগানো ফলক অনুযায়ী, কনৌজ থেকে আগত হরিপলাশ দত্তের অধস্তন পঞ্চদশ পুরুষ কামদেব দত্ত ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে দেবানন্দপুরে আসেন। তিনি রাধাকান্ত মন্দির ও চণ্ডীমন্দিরের অধিকার লাভ করেন। সেই সময় থেকেই দুর্গাপুজোর সূচনা বলে ফলকটিতে উল্লেখ রয়েছে। কামদেব দত্তের হাত ধরেই এই পুজোর প্রচলন—এমনটাই প্রচলিত পারিবারিক ইতিহাস। একসময় দত্ত মুন্সি বাড়ির দুর্গাপুজো ছিল আশপাশের গ্রামের মানুষের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পুজোর দিনগুলিতে এই বাড়িকে ঘিরেই জমে উঠত উৎসব। আজ পরিবারের সদস্যরা দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। তবু পিতৃপুরুষের ভিটের টানে দুর্গাপুজোর সময় কেউ কেউ ফিরে আসেন দেবানন্দপুরে। গাছপালার ঘন সবুজের আড়ালে দাঁড়িয়ে রয়েছে দত্ত মুন্সি বাড়ির প্...

বারুইপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো, দক্ষিণ ২৪ পরগণা (Durga Puja at the Roychowdhury Family Home, Baruipur, South 24 Parganas

Image
বারুইপুর রাসমাঠের কাছে পৌঁছলে দেখা যায়, সময়ের নিষ্ঠুর হাত একে একে মুছে দিয়েছে রায়চৌধুরী জমিদারির জৌলুস। বিশাল জমির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা ভগ্নপ্রায় দেওয়াল, ভেঙে পড়া প্রবেশদ্বারের অংশ আর জরাজীর্ণ মন্দিরগুলি আজও নীরবে বয়ে চলেছে এক হারিয়ে যাওয়া যুগের স্মৃতি। দুর্গাদালানে প্রবেশের দেউড়িটিও ক্ষয়ের চিহ্ন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে। কোনওমতে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে মেরামত করা হয়েছে তার ভগ্নপ্রায় শরীর। সদ্য চুনকামের চিহ্ন আর চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কারের পরিচয় জানান দেয়, আসন্ন দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভগ্নাবশেষের মধ্যে এ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুরের রায়চৌধুরী বাড়ি। একদা বিশাল জমিদারির কেন্দ্রস্থল, আজ যার অতীতের জৌলুস অনেকটাই মলিন। অথচ জমিদারি না থাকলেও বনেদিয়ানার প্রদীপটি এখনও নিভে যায়নি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে জীবন, বদলেছে পরিবারের সদস্যদের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান। কিন্তু বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের ঐতিহ্য আজও সমান নিষ্ঠায় আঁকড়ে ধরে রেখেছে এই পরিবার। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন এই দুর্গাপুজোর সূচনা...

বেলকুলাইয়ের দাসবাড়ির দুর্গাপুজো, হাওড়া (The Durga Puja of the Das Family of Belkulai, Howrah)

Image
শরতের রোদ এসে পড়েছে প্রাচীন খিলানওয়ালা জানলায়। আলো-ছায়ার খেলায় আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে হাওড়ার পাঁচলা অঞ্চলের বেলকুলাই গ্রামের দাস পরিবারের প্রাসাদোপম অট্টালিকা। বিশাল বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন স্তম্ভ, দীর্ঘ করিডোর আর বিস্তৃত উঠোন। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যের পরিসর মনে করিয়ে দেয় একসময়ের বনেদিয়ানার কথা। বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ পাঁচটি খিলান ও শৈল্পিক স্তম্ভে সজ্জিত ঠাকুরদালান। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে এই দালানই হয়ে ওঠে বাড়ির প্রাণকেন্দ্র। ধূপের গন্ধ, প্রদীপের আলো আর মন্ত্রোচ্চারণে প্রাচীন অট্টালিকার পরিচিত পরিবেশ পায় অন্য এক মাত্রা। তবে বেলকুলাইয়ের দাসবাড়ির পরিচয় শুধু তার স্থাপত্যের আভিজাত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব তার বৈষ্ণবীয় রীতিনীতি, প্রজন্মান্তরে চলে আসা পারিবারিক বিশ্বাস এবং গ্রামের মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। এখানে দেবী দুর্গা কেবল একটি পরিবারের আরাধ্যা নন, তিনি কার্যত গোটা গ্রামের আপনজন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দাসবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। পরিবারের প্রবীণা ...

ধরণীধর মল্লিক বাড়ির দুর্গাপুজো, কদমতলা হাওড়া (Durga Puja at the Dharanidhar Mallick Residence, Kadamtala, Howrah)

Image
হাওড়া কদমতলা অঞ্চলে দক্ষিণ ব্যাটরা শ্যামা পুজো ক্লাবের পাশ দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে ধরণীধর মল্লিক লেন। রাস্তার নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে এক পরিবারের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় মল্লিক বাড়ির দুর্গাপুজো, যা এবছর পা দিল ১২৫তম বর্ষে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৩০৯ বঙ্গাব্দে স্বর্গীয় ধরণীধর মল্লিক এই বাড়িতে দেবী দুর্গার আরাধনার সূচনা করেন। তারপর থেকে কেটে গিয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়। পূর্বপুরুষের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই পুজো আজ পৌঁছে গিয়েছে পরিবারের পঞ্চম-ষষ্ঠ প্রজন্মের কাছে। এতগুলি বছর পেরিয়েও পুজোর মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে সযত্নে ধরে রেখেছেন পরিবারের বর্তমান সদস্যরা। আর সেখানেই এই পুজোর বিশেষত্ব। মল্লিক বাড়ির দুর্গাপ্রতিমার দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার সাবেকি একচালার রূপ। ঐতিহ্যবাহী চালচিত্র আর ডাকের সাজে সজ্জিত দেবী যেন মনে করিয়ে দেন বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর সেই চিরপরিচিত ছবিকে। আজকের থিমনির্ভর উৎসবের ভিড়ে এই একচালার প্রতিমা যেন অন্য এক সময়ের প্রতিনিধি। এখানে নতুনত্বের চমক নেই, আছে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে থাকার এক আন্তরিক প্...

শ্যামবাবুর ঘাটের ধরবাড়ির দুর্গাপুজো, চুঁচুড়া: দুর্গা এবং জগন্নাথের সহবস্থান (Dhar Bari’s Durga Puja at Shyambabur Ghat, Chinsurah: The Coexistence of Durga and Jagannath)

Image
চুঁচুড়ার শ্যামবাবুর ঘাটে অবস্থিত ধরবাড়ি, যা বড় জগন্নাথবাড়ি নামেও পরিচিত হলেও, হুগলির প্রাচীন বনেদি বাড়িগুলির অন্যতম। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব তার দেবীমূর্তির রূপে; এখানে দেবী দুর্গাকে প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপে নয়, হর-গৌরী রূপে আরাধনা করা হয়। অর্থাৎ শিব ও গৌরীর যুগল রূপই এই পুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধরবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে মল্লিক পরিবারেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে জানা যায়। একসময় সম্পত্তিটির সঙ্গে মল্লিক পরিবারের সম্পর্ক ছিল এবং পরবর্তীকালে বিবাহসূত্রে তা ধর পরিবারের হাতে আসে। সেই সূত্রে বাড়িটি কোথাও কোথাও মল্লিকবাড়ি নামেও পরিচিত। এই ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীমতী কাঞ্চনবালা দাসীর নাম। জানা যায়, তিনি ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ২রা আষাঢ় এই ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠা করেন। বাড়িটির একটা অন্যতম আকর্ষণ হলো, এখানে জগন্নাথদেব প্রতিষ্ঠিত। শুধু জগন্নাথদেবই নন, একই পরিসরে তিনটি ধামের ভাবনাও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে—জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে পুরীধাম, রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে বৃন্দাবনধাম এবং শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে কাশী বিশ্বনাথ ধাম। এই ধর্মীয় পর...

ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের রানি ভিক্টোরিয়া মূর্তি: ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও এক নেপথ্য কূটনীতি (Queen Victoria's Statue at the Indian Museum: Colonial History and Behind-the-Scenes Diplomacy)

Image
১৮১৪ সাল। কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলে যাত্রা শুরু করে এশিয়ার প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম সংগ্রহশালা—ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, যা সাধারণ মানুষের কাছে আজও স্রেফ 'জাদুঘর' নামেই বেশি পরিচিত। 'এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল'-এর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন ও উদ্যোগের ফসল হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে।  এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ডেনমার্কের বিশিষ্ট প্রকৃতিবিদ ও উদ্ভিদবিদ ডা. নাথানিয়েল ওয়ালিচ, যিনি এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুরুতে এশিয়াটিক সোসাইটির নিজস্ব ভবনেই এর সংগ্রহ ও প্রদর্শনী চলত। কিন্তু দিন যত এগোতে থাকে, ততই দুর্লভ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জীবাশ্ম এবং শিল্পকর্মের ভাণ্ডার বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ, ১৮৭৮ সালে পার্ক স্ট্রিট ও চৌরঙ্গী রোডের সংযোগস্থলের এই বর্তমান সুবিশাল এবং দৃষ্টিনন্দন ভবনে জাদুঘরটিকে পাকাপাকিভাবে স্থানান্তরিত করা হয়। ব্রিটিশ স্থপতি ডব্লিউ. এল. গ্র্যানভিলের (W. L. Granville) চমৎকার নকশায় তৈরি ইতালীয় রেনেসাঁ ও নিও-ক্লাসিক্যাল শৈলীর এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি নিজেই ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমা...