Posts

বিস্মৃতির অতলে 'ঠাকুরবাড়ি': একটি রেশমি স্বপ্ন ও অভিশপ্ত এক জমিদারীর ইতিবৃত্ত (The 'Thakurbari' Buried in Oblivion: A Silken Dream and the Saga of a Cursed Estate)

Image
মেদিনীপুরের রূপনারায়ণ নদের বাঁকে একসময় রূপকথার মতো ইতিহাস জন্ম নিয়েছিল। যেখানে রেশম শিল্পের হাত ধরে ওলন্দাজ, ফরাসী আর ইংরেজ বণিকদের আনাগোনা ছিল, সেই উর্বর 'চেতুয়া পরগণা'র এক কোণে আজও পড়ে আছে এক টুকরো বিষণ্ন অতীত। দাসপুর থানার খোর্দা বিষ্ণুপুর গ্রামের পরিত্যক্ত এক 'ঠাকুরবাড়ি'—যা এখন কেবলই এক ধ্বংসপ্রাপ্ত আভিজাত্যের কঙ্কাল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষাশেষি রেশম ব্যবসার রমরমা তখন তুঙ্গে। সেই অর্থেই একদা জমিদারী গড়ে তুলেছিল রায়বংশ। যদুনাথ রায়ের হাতে যখন ১৮৪৮-৪৯ সালে শ্রীশ্রীরঘুনাথজীর মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, তখন এই ঠাকুরবাড়ি ছিল এক রাজকীয় ঠিকানা। প্রাচীর ঘেরা প্রাঙ্গণ, ঝকঝকে টেরাকোটার অলঙ্করণ আর বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসে টইটম্বুর এক জনপদ। কিন্তু আজ? সেই মূল ফটক নেই, সেই প্রতিপত্তি নেই— আছে কেবল নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি নিঃসঙ্গ মন্দির। লোকশ্রুতি বলে, দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই রায়বংশের পতনের বীজ লুকিয়ে ছিল এক মুহূর্তের অহংকারে। বাড়ির সামনে দিয়ে মাথা উঁচু করে হাঁটা নিষিদ্ধ ছিল যে জমিদারের রাজত্বে, তিনি একদিন ভুল করে বসেছিলেন নিজ গুরুদেবের সামনেই। আঙ্গিনার ডাব গাছের ...

হনুমান বালিকা বিদ্যালয়: ১৯২১ থেকে আজকের সালকিয়ায় নারীশিক্ষার আলোকবর্তিকা (Hanuman Balika Vidyalaya: A Beacon of Women's Education in Salkia Since 1921)

Image
হাওড়া সালকিয়ার বাঁধাঘাটের কাছে, ঘিঞ্জি শ্রী অরবিন্দ রোডে পা রাখলে, চারিদিকের দোকানপাট, কোলাহল আর ধুলোর মাঝেও এক অদ্ভুত পুরনো আমেজ পাওয়া যায়। সেই আমেজটা ঐতিহ্যের, চটকলের ধোঁয়ার আর এক বিস্মৃত সময়ের। এই রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাপি রঙের পুরোনো বড়ো বাড়ি— হনুমান বালিকা বিদ্যালয়। এই স্কুলটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো এক সমাজসেবার নীরব সাক্ষী। কলকাতার বড় বড় মারওয়াড়ি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো তখন গঙ্গার ওপারে হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে চটকল ও অন্যান্য ব্যবসা বিস্তার করছে। কিন্তু ব্যবসার লাভের টাকা দিয়ে সমাজসেবা আর শিক্ষার আলো জ্বালানোর যে মহান ব্রত তাঁরা নিয়েছিলেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ভবনটি।  খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, টানা বারান্দা এবং মোটা পিলারের এই বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে, মূল প্রবেশপথের দুইদিকেই চোখে পড়বে কয়েকটি শ্বেতপাথরের ফলক, যার থেকে স্কুলের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। এর জনকদের নাম— 'শেঠ সুরজমল নাগারমল' (Surajmull Nagarmull)। ১৯২০-৩০ এর দশকের কলকাতায় এই নামটি ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী এক শিল্পগোষ্ঠীর। বর্তমানে যে রাস্তাটি উত্তর কলকাতার মহাত্মা গান্ধী র...

বিশ্বজুড়ে মোরগ লড়াই: এক পুরানো, বিতর্কিত খেলা (Cockfighting Across the World: An Ancient, Controversial Sport)

Image
সেদিন ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটছিল হাওড়া হয়ে, গন্তব্য খড়গপুরের চৌরঙ্গী মোড়। পশ্চিম মেদিনীপুরে ঢুকে, একটা ছোট ব্রেক নেবার জন্য সবাই নামলাম বসন্তপুরের একটা ছোট চায়ের দোকানে। হাইওয়ের যে দিকে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম, তার উল্টোদিকে একটা ছোট মাঠের মধ্যে গাছের তলায় দেখলাম বেশ ভিড় জমেছে, যেন কোনো গ্রাম্য হাট বসেছে। আমাদের গাড়িচালক-দাদাকে জিজ্ঞাসা করতেই শুনলাম ওখানে নাকি মোরগ লড়াই চলছে!  বাংলার রাঢ়বঙ্গ অঞ্চলের খুব জনপ্রিয় খেলা হলো এই মোরগ লড়াই। মানব ইতিহাসে বহু পুরনো এবং পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে এর চল ছিল। এই খেলাটি প্রথমে ভারত, চীন, পারস্য এবং আশেপাশের পূর্বের দেশগুলিতে শুরু হলেও, পশ্চিমে এর পরিচিত হয় প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫২৪-৪৬০ সালের দিকে, গ্রিক সেনাপতি থেমিস্টোক্লিসের হাত ধরে। এরপর এটি এশিয়া মাইনর (তুরস্ক) এবং সিসিলি হয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। তুরস্কের জাতীয় খেলা বর্তমানে এই মোরগ লড়াই!   রোমানরা প্রথমে এই খেলাটিকে পছন্দ করত না। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা এই খেলায় এতটাই মত্ত হয় যায়, যে তারা মোরগ লড়াইয়ের মাঠে বাজি ধরে তাদের সব সম্পত্তি নষ্ট করত! রোম থেকে ...

মহিষা গ্রামের জাগ্রত সর্পদেবী মা মনসা: কৃষি ও লোকবিশ্বাসের প্রাচীন ধারা (Awakened Serpent Goddess Ma Manasa of Mahisha Village: An Ancient Stream of Agriculture and Folk Belief)

Image
এই লেখাটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মহিষা গ্রামের একটি খুব পুরোনো এবং জাগ্রত মন্দির নিয়ে, যা সর্পদেবী মা মনসার মন্দির নামে পরিচিত। এই মন্দিরে মানুষের বিশ্বাস অনেক গভীর এবং অনেক পুরনো। মন্দিরটি বেশিদিনের না হলেও এর পেছনের গল্প অনেক শতকের পুরনো। অনেক শত বছর আগে, এই জায়গাটা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা, মহিষা নামের একটি ছোট গ্রাম। এই গ্রামটি এখন জকপুর এবং মাদপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাঝামাঝি রয়েছে। এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন কৃষক। ফসল ভালো হলেও, তারা সবসময় সাপের ভয়ে চিন্তায় থাকতেন। তাই সাপের হাত থেকে বাঁচতে তারা সর্পদেবী মা মনসার পূজা শুরু করেন। বিশেষ করে "শ্রাবণ" এবং "ভাদ্র" মাসে, তারা সাপের কামড় থেকে রক্ষা পেতে মঙ্গলবার ও শনিবার মায়ের পূজা করতেন। তারা শুধু সাপের ভয় কাটানোর জন্য নয়, ভালো ফসলের জন্য মা-কে 'কৃষিদেবী' হিসেবেও পূজা করতেন। একবার খুব ভালো ফসল হওয়ার পর, সব কৃষক মিলে মায়ের পূজা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা বনের একটি জায়গায় মায়ের পূজা শুরু করেন। প্রতি বছর ফসল কাটার পর, প্রত্যেক কৃষক তাদের ফসলের একটি আঁটি মাকে দান করতেন। ...

হাওড়ার চক্রবর্তী বাড়ির সর্বমঙ্গলা রূপের আরাধনা: পরম্পরা ও অলৌকিকতার মেলবন্ধন (The Worship of Sarbamangala at Howrah's Chakraborty Family: A Blend of Tradition and Divine Manifestation)

Image
পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার রামরাজাতলা অঞ্চলের বকুলতলা লেনের এক সংকীর্ণ গলি পথে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন বনেদি দুর্গা পূজার ঐতিহ্য – চক্রবর্তী বাড়ির পূজা। ‘রামরাজাতলা ভাই ভাই সংঘ’-এর সন্নিকটে অবস্থিত এই পরিবারটি, জমিদার না হয়েও, তাদের দুর্গোৎসবকে এক স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক মহিমায় প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বাড়িতে মা দুর্গা পূজিত হন ‘সর্বমঙ্গলা’ রূপে। এই পূজার সূচনা হয়েছিল ১৯৪১ সালে স্বর্গীয় ধীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দ্বারা, তখন তিনি ছিলেন ঝিকিরার বাসিন্দা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সকল সদস্যরা রামরাজাতলার এই বকুলতলা লেনে স্থানান্তরিত হন। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে এক অলৌকিক বিশ্বাস। লোকমুখে প্রচলিত, মা কালীর স্বপ্নাদেশেই চক্রবর্তী পরিবারে ‘বুড়িমা’ ও ‘মা মঙ্গলা কালীর’ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সেই মায়ের নির্দেশেই এখানে দুর্গাপূজাও শুরু হয়। একারণেই স্থানীয়দের কাছে এই বাড়িটি কেবল দুর্গাপূজার স্থান নয়, বরং ‘মঙ্গলা কালীর মন্দির’ হিসেবেও পরিচিত। গলির ভেতরে এই বাড়ির অবস্থান খুঁজে বের করা কিছুটা কঠিন হলেও, এই পরিবারের সদস্যদের অমায়িক ব্যবহার তা সহজেই ভুলিয়ে দেয়। প্রথম দিকে এই আরাধনা শুরু হয়েছিল ...

উত্তর হাওড়ার ঢ্যাং পরিবার: বাটখারা থেকে বনেদি দূর্গাপূজা, এক অসামান্য ঐতিহ্যের দেড়শো বছর (The Dhang Family of North Howrah: From Weights to a Venerable Durga Puja, One Hundred and Fifty Years of Extraordinary Heritage)

Image
উত্তর হাওড়ার সালকিয়া অঞ্চলের এক আলোকিত ইতিহাস বহন করে চলেছে ঢ্যাং পরিবার এবং তাদের সুপ্রাচীন দুর্গাপূজা। যে পরিবারের পূর্বপুরুষের নাম অনুসারে হাওড়া স্টেশন থেকে সালকিয়া পেরিয়ে বাবুডাঙ্গার মোড়ের ডানদিকে বাঁক নেওয়া পথটি 'শ্রীরাম ঢ্যাং রোড' নামে পরিচিত, সেই ঢ্যাং বংশের শিকড় প্রোথিত ছিল হুগলি জেলার খানাকুলের নিকটবর্তী ঝিংড়া গ্রামে। যদিও এই বংশের মূল পদবী 'দে', কিন্তু 'ঢ্যাং' উপাধি প্রাপ্তির কারণ আজও লোকচক্ষুর আড়ালে। আদিপুরুষ গুরুদাস ঢ্যাং-এর পুত্র লক্ষ্মণ শাঁখার ব্যবসা করতেন। লক্ষ্মণ এবং তাঁর পুত্র শ্রীরাম ঢ্যাং প্রথম ঝিংড়া গ্রাম থেকে সালকিয়াতে এসে বসতি স্থাপন করেন। নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে শ্রীরাম ঢ্যাং সালকিয়াতে প্রতিষ্ঠা করেন পিতলের ঢালাই কারখানা, যেখানে তিনি ওজন করার বাটখারা তৈরি করে দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছন। শ্রীরাম ঢ্যাং-এর পাঁচ পুত্র, দেবেন্দ্রনাথ, মহাদেব, শিবচন্দ্র, রাখালচন্দ্র এবং তারকনাথ, পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যৌথ ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তারা ঢালাই কারখানার পাশাপাশি তেল ও তুলোর ব্যবসা শুরু করেন এবং সুইডেনে তৈরি 'টেক্কামার...

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিটেয় দুর্গাপুজো: সালকিয়া হাউসের বনেদি ঐতিহ্যের আখ্যান (Durga Puja at the Ancestral Home of Pulak Bandyopadhyay: The Story of Salkia House's Noble Heritage)

Image
হাওড়া বাঁধাঘাটের কাছেই, শ্রীরাম ঢ্যাং রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনার চোখে পড়ে যাবে একটা পুরোনো সাদা প্রাসাদোপম বাড়ি, যার গেটের বাইরে একটা দিকে লেখা আছে শালিখা হাউস, আর অন্যদিকে সালকিয়া হাউস। বাড়ির সামনে দাঁড়ালে মনের দৃশ্যপটে ভেসে আসবে অতীত থেকে ভেসে আসা কিছু বাংলা গানের সুর এবং একজন বিখ্যাত সুরকারের নাম... শ্রী পুলক বন্দোপাধ্যায়।  এই সালকিয়ার বন্দোপাধ্যায় বাড়ি যেমন বিখ্যাত বাঙালির এই গর্বের সুরকারের জন্য, তেমনই বিখ্যাত এর দুর্গাপুজো। পুজো শুরু হয়েছিল ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে, বাড়ির পূর্বপুরুষ জমিদার শ্রী রাধামোহন বন্দোপাধ্যায়ের আমলে। তবে পরিবারটি সমৃদ্ধি লাভ করে শ্রী রসিক কৃষ্ণ বন্দোপাধ্যায়ের আমলে। একটা সময় সালকিয়া বাজারটি এনাদের পরিবারের মালিকানাধীন ছিল। তবে বর্তমানে আর্থিক কারণে ভাটা পড়েছে আড়ম্বরে। তাও নিষ্ঠাভরে এনারা প্রায় ২৫০ বছর ধরে দুর্গাপূজা করে আসছেন। এবার আসা যাক পুজোর বিবরণে। বাড়ির ঠাকুরদালানে তৈরি হয় একচালার প্রতিমা। মহালয়ার পরের দিন দেবীর বোধন হয়, নিজস্ব ঠাকুরঘরে হয় চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠীর দিনে সন্ধ্যায় বেলবরণ দিয়...