Posts

বাংলার মন্দির স্থাপত্যের রত্ন: কালনার ২৫-রত্ন লালজি মন্দির (​A Gem of Bengali Architecture: Kalna’s Panchabimsati-Ratna Lalji Temple)

Image
অম্বিকা কালনার রাজবাড়ী চত্বরে স্বমহিমায় দণ্ডায়মান লালজি মন্দির কেবল বাংলার স্থাপত্যের একটি নিদর্শন নয়, বরং এটি ইতিহাস, অলৌকিক বিশ্বাস এবং সূক্ষ্ম কারুকলার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে (১৬৬১ শকাব্দ) বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের বিদুষী ও পরম বৈষ্ণবী মাতা ব্রজকিশোরী দেবী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার মন্দির নির্মাণশৈলীতে পঁচিশ-রত্ন বিশিষ্ট কাঠামো অত্যন্ত বিরল, আর লালজি মন্দির সেই বিরল ঐতিহ্যেরই শ্রেষ্ঠ স্বাক্ষর বহন করছে। এই মন্দিরের পত্তনের পেছনে যে কাহিনীটি লোকমুখে প্রচলিত, তা যেমন কৌতূহলোদ্দীপক তেমনি আবেগময়। কথিত আছে, এক পৌষ মাসে একদল নাগা সন্ন্যাসী গঙ্গাসাগরের মেলায় যাওয়ার পথে কালনায় যাত্রাবিরতি করেন। রাজমাতা ব্রজকিশোরী দেবী সেই সাধুদের তাঁবুর ভেতর থেকে এক অলৌকিক বালকের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। কৌতূহলী হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তিনি কোনো বালকের দেখা না পেলেও এক সৌম্যদর্শন সাধু এবং তাঁর প্রাণপ্রিয় আরাধ্য 'কানাই' বিগ্রহের দর্শন পান। রাজমাতা অনুভব করেন এই বিগ্রহ অত্যন্ত জাগ্রত। তিনি কানাইকে রাজবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করার মানত করেন এবং এক কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি সাধুকে...

কালনার ঐতিহাসিক রাসমঞ্চ: ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অনন্য মেলবন্ধন (The Historic Rasmancha of Kalna: A Unique Blend of Heritage and Architecture)

Image
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির নগরী কালনা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কালনা রাজবাড়ীর দক্ষিণ প্রবেশদ্বারের বাঁ-দিকে অবস্থিত ঐতিহাসিক রাসমঞ্চটি একসময় ছিল রাজবাড়ীর আভিজাত্য ও বৈষ্ণব সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই স্থানটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মর্যাদা পেলেও, এর প্রতিটি ইটে জড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের পুরনো উৎসবের ইতিহাস। বৈষ্ণব সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কার্তিকী পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা স্মরণে এখানে লালজী ও মদন গোপাল জীউর রাস উৎসব উদযাপিত হতো। অনেকে মনে করেন, নবদ্বীপের রাস উৎসবের ধারা মেনেই এই মঞ্চের পরিকাঠামো নির্মিত হয়েছিল। উৎসবের দিনগুলোতে এই অঞ্চল এক মায়াবী রূপ ধারণ করত; চারপাশ সাজানো হতো দেবদারু গাছের পাতায় এবং গ্যাসবাতির উজ্জ্বল আলোয়। উৎসবের একটি প্রধান আকর্ষণ ছিল নগর পরিক্রমা। রাজবাড়ী থেকে বাদ্যভাণ্ড ও সঙসহ একটি বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়ে বর্তমান চকবাজার এলাকা অর্থাৎ 'চক্ অম্বিকা' প্রদক্ষিণ করত, যা স্থানীয় জনজীবনে এক বিশেষ উৎসবের আমেজ তৈরি কর...

অম্বিকা কালনার রত্নেশ্বর ও জলেশ্বর শিবমন্দির: স্থাপত্য ও ইতিহাস (Ratneshwar and Jaleshwar Shiva Temples of Ambika Kalna: Architecture and History)

Image
অম্বিকা কালনা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও অসাধারণ মন্দির স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এই শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দুটি প্রাচীন শিবমন্দির- রত্নেশ্বর ও জলেশ্বর। এই মন্দির দুটি একইরকম স্থাপত্যশৈলী বহন করে এবং এদের নির্মাণকাল ও নির্মাতার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। রত্নেশ্বর শিবমন্দির: রত্নেশ্বর শিবমন্দিরটি কালনার মূল রাজবাড়ির বাইরে, পূর্ব দিকে অবস্থিত। এই ইঁটের তৈরি মন্দিরের সামনের অংশে সামান্য টেরাকোটার কাজ দেখা যায়। সেখানে একটি রথের ছবি খোদাই করা আছে, যার পতাকা উড়ছে। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীতে উড়িষ্যা-প্রদেশের প্রভাব সুস্পষ্ট। এটি একটি পঞ্চরত্ন মন্দির, অর্থাৎ এর চূড়ায় চারটি ছোট চূড়া এবং কেন্দ্রে একটি প্রধান চূড়া রয়েছে। প্রতিটি চূড়ারই চারটি দিকে প্রবেশপথ আছে। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গটি কৃষ্ণবর্ণের, যা জলেশ্বর শিবলিঙ্গের মতো দেখতে। মন্দিরের গায়ে বা প্রবেশদ্বারে কোনো স্থাপন ফলক না থাকায় এর নির্মাণকাল বা নির্মাণকারীর পরিচয় জানা যায়নি। তবে এর গঠনশৈলী দেখে এটি প্রতাপেশ্বর মন্দিরের সমসাময়িক বলে ধারণা করা হয়। জলেশ্বর শিবমন্দির: জলেশ্বর শিবমন্দিরট...

কালনার গোপাল মন্দির: ইতিহাস, স্থাপত্য এবং লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধন (Gopalji Temple of Kalna: A Confluence of History, Architecture, and Folk Culture)

Image
বর্ধমানের কালনা শহরের সিদ্ধেশ্বরীপাড়ায়, সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের কাছেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অসাধারণ স্থাপত্যকীর্তি—গোপালজী মন্দির। এটি পঞ্চবিংশতি রত্নমন্দির বা পঁচিশ চূড়ার মন্দির হিসেবে পরিচিত। বর্ধমান রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা তিলকচাঁদের আমলে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও প্রচলিত আছে যে রাজ পরিবারের কৃষ্ণচন্দ্র বর্মণ এটি নির্মাণ করান। এটি রাজবাড়ীর দুটি সুবিশাল পঁচিশ চূড়া মন্দির—লালজি মন্দির ও কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরের অনুকরণে নির্মিত তৃতীয় পঁচিশ চূড়ার মন্দির। লালজি ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির দক্ষিণমুখী হলেও গোপাল মন্দিরটি পূর্বমুখী। গোপাল মন্দিরের নির্মাণশৈলী 'রত্ন' স্থাপত্যরীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাড়ে তিন থেকে চার ফুট উঁচু ভিত্তিবেদীর ওপর চতুষ্কোণ ভূমি নকশার ওপর স্থাপিত হয়েছে এই পঁচিশ চূড়া। মন্দিরের প্রথম স্তবকে ১২টি, দ্বিতীয় স্তবকে ৮টি এবং তৃতীয় স্তবকে ৪টি চূড়া স্থাপিত হয়েছে, যার শীর্ষে শোভা পাচ্ছে মূল চূড়াটি। এর মূল প্রবেশপথের দু’পাশে দুটি প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে। মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর টেরাকোটার কাজ। পোড়ামাটির এই অসা...

কুঠি ঘাট থেকে সাহেব কুঠি: বরানগরের হারানো স্থাপত্য (From Kuthi Ghat to Saheb Kuthi: The Lost Architecture of Baranagar)

Image
কলকাতার উত্তর সীমানার ব্যস্ত জনপদ বরানগর। আজ আমরা এই শহরের যে আধুনিক রূপ দেখি, কয়েকশ বছর আগে তার ছবিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। এক সময় গঙ্গার বুক চিরে পালের জাহাজ আসত, আর সেই জাহাজে করে এ দেশে আসত পর্তুগিজ, ডেনিশ ও ডাচ বণিকরা। গঙ্গার পূর্ব পাড়ের এই অঞ্চলটি তখন ছিল বাণিজ্যিক রণক্ষেত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৭০০ সালের শুরুর দিকে এখানেই গড়ে ওঠে ডাচ বা ওলন্দাজ উপনিবেশ। ডাচ গভর্নররা তাদের বাণিজ্য বিস্তারের জন্য এই জায়গাটিকে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৮১৪ সালে এই অঞ্চলটি বৈবাহিক চুক্তির ভিত্তিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়। শুধুমাত্র শ্রী রামকৃষ্ণদেবের পদধূলিধন্য অঞ্চল নয়, বরানগরের এই রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পালাবদলের ইতিহাসে আজও আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে ইউরোপীয় স্থাপত্যের অস্পষ্ট ছাপ। গঙ্গার ধারের 'কুঠি ঘাট' নামটা আমাদের অতি পরিচিত, কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস আজ বিস্মৃতির আড়ালে। ওলন্দাজ গভর্নরের থাকার জন্য গঙ্গার ঠিক ধারেই গড়ে উঠেছিল এক বিশাল দ্বিতল বাগানবাড়ি। 'কোঠি' থেকে আসা এই 'কুঠিবাড়ি'টি এক সময় জাঁকজমকে ভরপুর ছিল। আজ সেই প্রাসাদের গুটিকতক ...

বিস্মৃতির অতলে 'ঠাকুরবাড়ি': একটি রেশমি স্বপ্ন ও অভিশপ্ত এক জমিদারীর ইতিবৃত্ত (The 'Thakurbari' Buried in Oblivion: A Silken Dream and the Saga of a Cursed Estate)

Image
মেদিনীপুরের রূপনারায়ণ নদের বাঁকে একসময় রূপকথার মতো ইতিহাস জন্ম নিয়েছিল। যেখানে রেশম শিল্পের হাত ধরে ওলন্দাজ, ফরাসী আর ইংরেজ বণিকদের আনাগোনা ছিল, সেই উর্বর 'চেতুয়া পরগণা'র এক কোণে আজও পড়ে আছে এক টুকরো বিষণ্ন অতীত। দাসপুর থানার খোর্দা বিষ্ণুপুর গ্রামের পরিত্যক্ত এক 'ঠাকুরবাড়ি'—যা এখন কেবলই এক ধ্বংসপ্রাপ্ত আভিজাত্যের কঙ্কাল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষাশেষি রেশম ব্যবসার রমরমা তখন তুঙ্গে। সেই অর্থেই একদা জমিদারী গড়ে তুলেছিল রায়বংশ। যদুনাথ রায়ের হাতে যখন ১৮৪৮-৪৯ সালে শ্রীশ্রীরঘুনাথজীর মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, তখন এই ঠাকুরবাড়ি ছিল এক রাজকীয় ঠিকানা। প্রাচীর ঘেরা প্রাঙ্গণ, ঝকঝকে টেরাকোটার অলঙ্করণ আর বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসে টইটম্বুর এক জনপদ। কিন্তু আজ? সেই মূল ফটক নেই, সেই প্রতিপত্তি নেই— আছে কেবল নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি নিঃসঙ্গ মন্দির। লোকশ্রুতি বলে, দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই রায়বংশের পতনের বীজ লুকিয়ে ছিল এক মুহূর্তের অহংকারে। বাড়ির সামনে দিয়ে মাথা উঁচু করে হাঁটা নিষিদ্ধ ছিল যে জমিদারের রাজত্বে, তিনি একদিন ভুল করে বসেছিলেন নিজ গুরুদেবের সামনেই। আঙ্গিনার ডাব গাছের ...

হনুমান বালিকা বিদ্যালয়: ১৯২১ থেকে আজকের সালকিয়ায় নারীশিক্ষার আলোকবর্তিকা (Hanuman Balika Vidyalaya: A Beacon of Women's Education in Salkia Since 1921)

Image
হাওড়া সালকিয়ার বাঁধাঘাটের কাছে, ঘিঞ্জি শ্রী অরবিন্দ রোডে পা রাখলে, চারিদিকের দোকানপাট, কোলাহল আর ধুলোর মাঝেও এক অদ্ভুত পুরনো আমেজ পাওয়া যায়। সেই আমেজটা ঐতিহ্যের, চটকলের ধোঁয়ার আর এক বিস্মৃত সময়ের। এই রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাপি রঙের পুরোনো বড়ো বাড়ি— হনুমান বালিকা বিদ্যালয়। এই স্কুলটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো এক সমাজসেবার নীরব সাক্ষী। কলকাতার বড় বড় মারওয়াড়ি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো তখন গঙ্গার ওপারে হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে চটকল ও অন্যান্য ব্যবসা বিস্তার করছে। কিন্তু ব্যবসার লাভের টাকা দিয়ে সমাজসেবা আর শিক্ষার আলো জ্বালানোর যে মহান ব্রত তাঁরা নিয়েছিলেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ভবনটি।  খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, টানা বারান্দা এবং মোটা পিলারের এই বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে, মূল প্রবেশপথের দুইদিকেই চোখে পড়বে কয়েকটি শ্বেতপাথরের ফলক, যার থেকে স্কুলের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। এর জনকদের নাম— 'শেঠ সুরজমল নাগারমল' (Surajmull Nagarmull)। ১৯২০-৩০ এর দশকের কলকাতায় এই নামটি ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী এক শিল্পগোষ্ঠীর। বর্তমানে যে রাস্তাটি উত্তর কলকাতার মহাত্মা গান্ধী র...