Posts

চন্দননগরের জোড়া ঘাট : দুর্গাচরণ রক্ষিত ও চন্দননগরের গৌরবময় অতীত (The Twin Ghats of Chandannagar: Durgacharan Rakshit and the Glorious Past of Chandannagar)

Image
চন্দননগরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে গঙ্গা তীরবর্তী স্ট্র্যান্ড রোডে আজও সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ‘জোড়া ঘাট’, যা স্থানীয়দের কাছে ‘রক্ষিত ঘাট’ নামেই বেশি পরিচিত। এই ঘাটটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বরং এটি চন্দননগরের একটা আইকন। এই ঘাটকে জোড়া ঘাট বলা হয় কারণ এই ঐতিহাসিক ঘাটটির দুপাশে দুটি আলাদা সিঁড়ি বা ঘাট একসঙ্গে যুক্ত রয়েছে। মাঝখানে একটি সুদৃশ্য মণ্ডপ বা বসার স্থান রেখে এর দুই পাশে দুটি প্রতিসম ঘাট বা নামার পথ তৈরি করা হয়েছিল। ১৯২১ সালে এই ঘাটটি নির্মাণ করেছিলেন শ্যামাচরণ রক্ষিত, তাঁর পিতা দুর্গাচরণ রক্ষিতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ঘাটের স্থাপত্যরীতিতে ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য শৈলীর এক চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। এর বিশেষ আকর্ষণ হলো এর পীচ রঙের চাঁদোয়া বা ছাদ, যা দূর থেকেই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এছাড়া ঘাটের সরু স্তম্ভ, ইউরোপীয় স্টাকো কারুকার্য এবং হাতি ও ফুলের সূক্ষ্ম মোটিফের ব্যবহার স্থাপত্যকলায় এক বিরল নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে। চন্দননগরের আইকন হিসেবে পরিচিত এই জোড়া ঘাট আজও তার গরিমা ধরে রেখেছে। জোড়া ঘাটের নেপথ্যে থাকা মানুষটি অর্থাৎ দুর্গাচরণ রক্ষি...

বড়ো শীল বাড়ীর দুর্গাপুজো, চুঁচুড়া (হুগলি জেলা) Boro Sheel Bari Durga Puja, Chinsurah (Hooghly District)

Image
​বাংলার প্রাচীন জনপদ চুঁচুড়ার মাটিতে কান পাতলে শোনা যায় শতবর্ষের নানা অজানা গল্প। এই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় জুড়ে রয়েছে শীলবাড়ির নাম। চৈতন্য শীলের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ ছিলেন বিচক্ষণ নীলাম্বর শীল। অষ্টাদশ শতকে বর্গী ও ইংরেজদের রক্তচক্ষু এবং নানামুখী অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে তিনি পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন ওলন্দাজদের গুস্তাফ দুর্গের প্রাচীরঘেরা নিরাপদ চুঁচুড়া শহরে। ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় এখানেই; বাণিজ্যলক্ষী সদয় হন নীলাম্বরের ওপর। চুঁচুড়াতে পা রেখেই তিনি ও তাঁর বড় ছেলে জগমোহন শুরু করেন সরাফি ও মহাজনী কারবার। এই শহরেই গড়ে ওঠে তাঁদের মূল সরাফি কুঠি। ​চুঁচুড়ার এই কুঠিকে ‘হেড অফিস’ বা প্রধান কার্যালয় হিসেবে রেখেই বাংলাজুড়ে ব্যবসার জাল বিস্তার করেন তাঁরা। একে একে কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, কালনা, কাটোয়া, খিরপাই ও সুধাসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে গড়ে ওঠে নীলাম্বর শীলের একাধিক সরাফি শাখা বা কুঠি। এই সমস্ত কেন্দ্র থেকে প্রধানত হুন্ডির কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সোনা ও রূপোর মুদ্রা বিনিময়ের কারবার চালানো হতো। দূর-দূরান্তে এক কুঠির টাকা নিরাপদে অন্য কুঠিতে স্থানান্তরের জন্য নীলাম্বরের...

নৃত্যগোপাল স্মৃতিমন্দির ও চন্দননগর পুস্তকাগার: চন্দননগর হুগলি (Nrityagopal Smritimandir and Chandannagar Pustakagar, Chandannagar, Hooghly)

Image
চন্দননগর বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরাসি আমলের সেই স্নিগ্ধ আবেশ, গঙ্গা আর ইতিহাসের মিশেল। এই শহরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলো ‘নৃত্যগোপাল স্মৃতিমন্দির ও চন্দননগর পুস্তকাগার’। এটি কেবল একটি দালান নয়, বরং চন্দননগরের শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক দেড়শো বছরের দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী। ১৮৭৩ সালের পয়লা অক্টোবর শ্রী যদুনাথ পালিত মহাশয়ের হাত ধরে চন্দননগর পুস্তকাগারের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশের উর্দিবাজারে একটি ভাড়া বাড়িতে এর জন্ম। শুরুর দিকে লাইব্রেরিটির স্থায়িত্ব ছিল অনিশ্চিত; কখনো নীচু পল্লী, কখনো কাঁসারিপাড়ায় বাড়ি বদল করতে করতে চলেছে এর কার্যাদি। যদুনাথ বাবু নাটকের অনুরাগী ছিলেন। বন্ধু মতিলাল শেঠ ও মহেন্দ্রনাথ নন্দীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি থিয়েটার দলও গড়েছিলেন। কিন্তু গ্রন্থাগারটি বাঁচানোর তাগিদে তিনি নিজের শখের থিয়েটারের সামগ্রী পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এই লাইব্রেরিকে এক স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব চন্দননগরের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক ও প্রথম মেয়র শ্রী হরিহর শেঠের। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাগবাজারে তাঁর পিতা নিত্যগোপাল শেঠের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ...

ঘোষাল পরিবারের দুর্গাপুজো, কোন্নগর হুগলি (The Traditional Durga Puja of the Ghoshal Family, Konnagar, Hooghly)

Image
হুগলি জেলার কোন্নগরে, রাজ রাজেশ্বরী যুব সমিতির কাছে রয়েছে এই অঞ্চলের একটি বিখ্যাত বনেদি পরিবার। ১৪৫৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন এই অঞ্চল জঙ্গলঘেরা জনশূন্য প্রান্তর ছিল, সেই মাটিতেই প্রথম প্রদীপ জ্বেলেছিল এই ঘোষাল পরিবার। দিল্লির লোদি রাজবংশের সমসাময়িক সেই প্রাচীন দিনে এখানকার ঠাকুরদালানে শুরু হয়েছিল আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার আরাধনা। কালের পরিক্রমায় মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে পাওয়া রাজকীয় সনদ বা শংসাপত্র আজও সযত্নে বুকে আগলে রেখেছে এই বাড়ি।  শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ আমলে এই বনেদি পুজোর প্রতি সম্মান জানিয়ে ইংরেজ সরকার থেকে প্রতি বছর ৭৫০ টাকা অনুদান আসত। সেই অনুদান এতটাই মহার্ঘ ছিল যে, পুজোর যাবতীয় খরচ মিটিয়েও উদ্বৃত্ত টাকা ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে শ্রীরামপুর কোষাগারে বা খাজাঞ্চি খানায় ফেরত পাঠাতেন বাড়ির লোকজন। ইতিহাসের সেই সোনালী পাতাগুলো আজ স্মৃতির মণিকোঠায় জমা হলেও, সাড়ে পাঁচশ বছরের বেশি এই পুজো আজও তার সমস্ত মহিমা নিয়ে সগৌরবে টিকে রয়েছে। ঘোষাল বাড়ির দুর্গা প্রতিমা মানেই একচালা সাবেকি রূপ। উলটোরথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। রূপসজ্জার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে ব্রিটিশ...

মন্ডলবাড়ীর দুর্গাপুজো, গণ্ডলপাড়া চন্দননগর (The Mandal Bari Durga Puja, Gondalpara, Chandannagar)

Image
বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে কিভাবে হিন্দু সংস্কৃতি মিশে যায়, তার একটা বড়ো উদাহরণ হলো চন্দননগরের গোন্দলপাড়ার ঐতিহাসিক মণ্ডল পরিবারের দুর্গোৎসব। এছাড়াও, এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার নানা অঞ্চল, আবিসিনিয়া এবং অধুনা আফগানিস্তানের প্রাচীন বেশ কিছু রীতির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা অতীতে নুনের এবং জাহাজের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অধুনা দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপে তাঁদের নিজস্ব বন্দরও ছিল। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তাঁদের জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর, পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পান বাড়িতে দুর্গা পুজো শুরু করার। ঘটপুজো শুরু হলেও, ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতিমা গড়ে পুজো শুরু হয়।  এনারা ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে  জলপথে চন্দননগরে এসে গঙ্গার ধারে বিশাল ঠাকুরদালান সমেত পাশ্চাত্যের ছোঁয়ায় বসতবাড়িটি তৈরি করেন। এরপর থেকে নতুন বাড়িতেই পুজো হতে থাকে। ব্যবসায়িক সূত্রে ফরাসিদের সাথে এদের সুসম্পর্ক হবার জন্য, ফরাসি সাহেবদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো হতো এবং বাড়ির হলঘরে গানবাজনা হতো, যেখানে ফরাসিরা সকল আনন্দে ও উৎসবে সামিল হতেন। বর্তমান সময়েও এই পরিবারের প...

হাওড়া আন্দুলের প্রেমিক ভবনের দুর্গাপুজো (The Durga Puja of Premik Bhavan in Andul, Howrah)

Image
হাওড়ার আন্দুলের দক্ষিণ পাড়ায় একটি শান্ত ও স্নিগ্ধ ভবন রয়েছে, যা 'প্রেমিক ভবন' নামে পরিচিত। এই ভবনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহ্যবাহী বংশের ইতিহাস, এক মহান সাধকের জীবন ও বাংলার এক নিজস্ব  সাধন সঙ্গীতের ধারা। অবিভক্ত বঙ্গের অন্যতম সিদ্ধ তন্ত্রবিশারদ , আন্দুলের শান্ডিল্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা "আগমতত্ত্ববিলাস" প্রণেতা নাটোর রাজগুরু সর্বানন্দ বংশীয় ন-পাড়ীয় মহাসাধক মহাপণ্ডিত শ্রীমৎ রঘুনাথ তর্কবাগীশের ভিটে এবং তাঁর অধঃস্তন ষষ্ঠ পুরুষ তথা যুগ পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের পিতৃকুলের কুলগুরু ( স্বামী বিবেকানন্দের পিতা বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতা ভুবনেশ্বরী দেবীর দীক্ষা গুরু ছিলেন প্রেমিক মহারাজ ) এবং আন্দুল কালী কীর্ত্তন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ তন্ত্রচূড়ামণি কবিরত্ন শ্রী শ্রী প্রেমিক মহারাজের পৈতৃক আবাস ও আন্দুল কালী কীর্ত্তন সমিতির সিদ্ধ পীঠ আন্দুলের প্রেমিক তীর্থ " প্রেমিক ভবন "। কবিরত্ন শ্রী শ্রী প্রেমিক মহারাজের উত্তরসূরীরা প্রেমিক মহারাজের স্মরণে তাদের এই  বাসভবনের নামকরণ করেন "  প্রেমিক ভবন "। বাংলার ১২৫১ সালে , ৪ ঠা ফাল্গুন , শুক্লাষ্টমী...

বামাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার : বাগনানের আদি ও শ্রেষ্ঠ মিষ্টির দোকান : হাওড়া জেলা (Bamacharan Mishtanna Bhandar: Bagnan’s Original and Premier Sweet Shop: Howrah District)

Image
মিষ্টিপ্রেমী মানুষের কাছে বাগনান স্টেশন বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি নাম—"বামাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার"। স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত এই দোকানটি আজকের যুগেও আপনাকে অতীতে টেনে নিয়ে যাবে।  কড়ি-বরগার ছাদ, কাঁচ লাগানো কাঠের শোকেস, বেঞ্চের ওপর সাজানো মিষ্টির নৌকা ও নোনতার ঝুড়ি আর চৌকি-সদৃশ পাটায় বসে মালিকের তবিল সামলানোর দৃশ্য—সব মিলিয়ে এই দোকানটি কেবল একটি মিষ্টির দোকান নয়, বরং আস্ত এক ইতিহাস। সত্যি বলতে, পুরো দোকানটির মধ্যে দুটি ঢাউস রেফ্রিজারেটর বড়োই বেমানান। ১৩১০ বঙ্গাব্দে (১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী দোকানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানস চক্রবর্তীর দাদু বামাচরণ চক্রবর্তী। তবে অবাক করার বিষয় হলো, বামাচরণবাবু প্রথমে কোনো মিষ্টির দোকান খোলেননি। সেকালে তাঁর ব্যবসা ছিল তেলেভাজার। চপ ও বেগুনি ভাজার পাশাপাশি তিনি শখ করে দানাদার ও সন্দেশ তৈরি করতেন। কিন্তু তেলেভাজার সঙ্গে তাঁর হাতের মিষ্টিও খদ্দেরদের দারুণ পছন্দ হয়ে যায়। মানুষের চাহিদাই তাঁকে ধীরে ধীরে মিষ্টির পরিধি বাড়াতে এবং পাকাপাকিভাবে মিষ্টির দোকান খুলতে উৎসাহিত করে। ...