সৈয়দ আলী শাহর দরগা, হেস্টিংস কলকাতা (Syed Ali Shah Dargah, Hestings Kolkata)

খিদিরপুর ব্রিজের পাশে ময়দানের ধারে যেখানে বাসগুলো স্টপেজ দেয়, তার নাম হেস্টিংস। ফ্লাইওভারটা এখান থেকে শুরু হয়েছে, ময়দানের ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে এগিয়ে গেছে সেটা। একপাশে নন্দকুমারের ফাঁসির কুয়ো, অপরদিকে ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব। এরই মাঝে দেখা যায় একটি শান্ত দরগা, যার পোশাকি নাম সৈয়দ আলী শাহর দরগা হলেও, জনমুখে সৈয়দ বাবার দরগা নামেই পরিচিত।



সবুজ মাঠের মধ্যে একটি অতি প্রাচীন বটগাছ, আর তার নিচেই সৈয়দ বাবার মাটির সমাধি। এই গাছটি ঘিরেই গড়ে উঠেছে দরগা। তবে সবথেকে সুন্দর দৃশ্য হলো, দরগা চত্বরে শয়ে-শয়ে পায়রা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দানা খাচ্ছে।



দরগার ভিতরে খুবই শান্ত পরিবেশ। ফুল ও ধূপের গন্ধে ভিতরটা মো মো করে। এখানে মুসলিম ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের মানুষও এসে প্রার্থনা করেন, মনস্কামনা করে সুতো বেঁধে যান, বাবার সমাধিতে চাদর চড়ান। দরগার ভিতরে ছবি তোলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ আছে। আমি সৈয়দ বাবার পাশে আরেকটি সমাধি দেখলাম, জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওটা ওনার স্ত্রীর সমাধি। মাজারের বাইরে একটা প্লাস্টিকের রেকবি করে বাবার সমাধির ওপরে ব্যবহার করা পুরোনো গোলাপের শুকিয়ে যাওয়া পাপড়ি রাখা আছে, চাইলে ভক্তরা নিয়ে যেতে পারেন।



দরগার ইতিহাস সম্পর্কে কিন্তু কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই। কিংবদন্তি ও লোককথায় রয়েছে এর ইতিহাস। অলৌকিক ক্ষমতা-সম্পন্ন বাবা আরবদেশ থেকে এসে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে স্থানীয় মানুষের উপকার শুরু করার ফলে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। একশো বছরের বেশি বাঁচার পর বাবার মৃত্যু হয় ১১১৭ হিজরীতে (যদিও এই তারিখটা নিয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে, কারণ ২০২২ সালে চলছে ১৪৪৩ হিজরী), এবং বর্তমান স্থানে বাবার সমাধি দেওয়া হয়।

অনেকবার নাকি এই দরগাটি স্থানান্তকরণের চেষ্টা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিলিটারিরা দরগা সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল, আর সেই সময়েই একদিন একটা যুদ্ধবিমান দরগার ওপর দিয়ে যাবার সময় আগুন ধরে যায় ও ভেঙে পরে। এছাড়াও ফ্লাইওভার বানানোর সময় নাকি দরগার ওপর দিয়েই বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই তা বিফল হয়। তাই মাঝখানে দরগা রেখে, ফ্লাইওভারটি চারদিক-দিয়ে বানানো হয়।



প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার করে এখানে সিন্নি মানত করা হয়। এছাড়া বাবার উরস উপলক্ষ্যে নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে দুদিন ধরে বড়ো করে অনুষ্ঠান হয়। তখন প্রচুর ভিড় হয় এখানে।

দরগার বয়স যতই যাক না কেন আর তার কিংবদন্তী যাই থাক না কেন, খিদিরপুর অঞ্চলে এই দরগাটি যে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করেছে, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

Comments

Popular posts from this blog

গোবিন্দ সেন লেনের চুনী মণি দাসীর রথযাত্রা: এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য (Chuni Mani Dasi's Rath Yatra on Gobinda Sen Lane: A Century-Old Legacy)

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার প্রাচীনতম দেওয়ালচিত্রের গল্প (The story of only oldest Fresco at South 24 Parganas)

জন্নত-এ-জাকারিয়া : রমজানের সময় জাকারিয়া স্ট্রিটে ইফতারের খানা-খাজানার ইতিহাস (Jannat-e-Zakaria : a brief history of the Iftar foods available at Zakaria Street in Ramzan time)