ডাচ্ সমাধিক্ষেত্র, কাশিমবাজার (Dutch Cemetery, Cossimbazar)
অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত কাশিমবাজার ছিল একটি সমৃদ্ধ বন্দর জনপদ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাবসাকেন্দ্র। রেশম, হাতির দাঁতের কাজ, কাঁসা-পিতল শিল্প, তাঁত শিল্প ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ ছিল মূল বেচাকেনার পণ্য। সারা ভারত থেকে ব্যাবসায়ীরা তো আসতেনই, বিদেশ থেকে আসতেন ইউরোপিয়ান ব্যাবসায়ীরা। সেরকম হল্যান্ড থেকে ডাচরা এসে, এখানে একটি কুঠিবাড়ি (১৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) এবং কারখানা (১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ) স্থাপন করেন, এবং কালিকাপুরে গড়ে ওঠে একটি ছোট ডাচ কলোনি। সময়ের সাথে সাথে, প্রয়োজন হয় একটি সমাধিক্ষেত্রের।
আজকে যেখানে মুর্শিদাবাদ জেলার কাশিমবাজার রেল স্টেশন, তার লাগোয়া কালিকাপুর অঞ্চলে রেলগেটের কাছেই রয়েছে একটি প্রাচীন ডাচ সমাধিক্ষেত্র। এর উত্তরদিকে ছিল ডাচ কুঠিবাড়ি এবং কারখানা... যদিও আজকে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সমাধিক্ষেত্রটি বর্তমানে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এএসআই-এর বোর্ড অনুযায়ী, মূলত ডাচ কারখানায় কর্মরত কর্মীদের মধ্যে ৪৭ জনের সমাধি রয়েছে এখানে। এখানকার প্রাচীনতম সমাধিটি ড্যানিয়েল ভ্যান দার ম্যুলের, যিনি ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন। সর্বশেষ এই কবরখানা ব্যবহৃত হয় ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে।
এবার আসা যাক সমাধিক্ষেত্রের বর্ণনায়। দুটি দিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং সেখানে গেট আছে। বাকি দুটো দিকে এমনিতেই ঢোকা যায়। খাতাকলমে ৪৭টি সমাধি থাকলেও, বাস্তবে ২০টির বেশি সমাধি দেখা যায় না এখানে। সমাধিগুলি বিভিন্ন আকৃতির, তবে সবথেকে সুন্দর সমাধিটি হলো তামেরাস ক্যান্টার ভিশের (Tammerus Canter Visscher) –এর। এটির আদলেই চুঁচুড়াতে সুস্যানা আন্না-মারিয়ার সমাধিটি তৈরী করা হয়েছে।
তবে বর্তমানে সমাধিক্ষেত্রটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশ ধুঁকছে। সেরকম পর্যটকরা আসেন না, আর গার্ডরুমটি অনন্তকাল ধরে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অধিকাংশ সমাধির ফলক হয় নেই, অথবা চুরি হয়ে গিয়েছে। দিনের বেলা স্থানীয় লোকজন আড্ডা মারার জন্য এবং ক্রিকেট খেলার জন্য সমাধিক্ষেত্রের জমিটি ব্যবহার করে। ইতিউতি কিছু খালি মদের বোতলও পড়ে থাকতে দেখা গেলো। যদি সত্ত্বর সরকার থেকে পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে কালের প্রবাহে যতদিন সম্ভব এটি টিকে থাকবে... তারপর মুছে যাবে কাশিমবাজারের ডাচেদের একমাত্র স্মৃতিক্ষেত্র।
তথ্যসূত্র:
১. The Dutch in Bengal and Bihar 1740-1825 A.D. by Kalikinkar Datta
২. মানস বাংলা ইউটিউব চ্যানেল।
Comments
Post a Comment